নানা সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে
- আপলোড সময় : ২৩-১২-২০২৫ ০৮:৩৩:৫২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৩-১২-২০২৫ ০৮:৩৩:৫২ পূর্বাহ্ন
হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা আমাদের সামনে এক গভীর ও উদ্বেগজনক বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে। কোথাও প্রকাশ্য দিবালোকে গরু-মহিষ লুট, কোথাও হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা, কোথাও ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি, আবার কোথাও মাছ শিকারের নামে বোরো জমি অনাবাদি হওয়ার শঙ্কা - সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, এই জেলার আইনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য ও কৃষি সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় তৎপরতা কোথায়?
দোয়ারাবাজার উপজেলায় প্রায় ৯৭ লাখ টাকা মূল্যের ৯৩টি গরু ও মহিষ লুটের অভিযোগ নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা নিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো- থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হওয়া। সংঘবদ্ধ চক্রের এমন দাপট যদি গ্রামপর্যায়ে নির্বিঘেœ চলতে পারে, তবে নাগরিক নিরাপত্তা কথাটাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রায় ২৫ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসা ২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের করুণ দশা আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার করুণ চিত্র তুলে ধরছে। শীত এলেই ঠা-াজনিত রোগে আক্রান্ত শিশু ও বৃদ্ধদের উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে হাসপাতাল কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছেন। শয্যা সংকটে মেঝেতে চিকিৎসা - এটি কোনোভাবেই সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচায়ক হতে পারে না। বছরের পর বছর একই সংকট চললেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ না থাকা স্বাস্থ্যখাতে পরিকল্পনার ঘাটতিরই প্রমাণ।
এদিকে দোয়ারাবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমির টপ সয়েল কেটে বিক্রির অবাধ তৎপরতা ভবিষ্যৎ কৃষি ও পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি সৃষ্টি করছে। প্রশাসনের চোখের সামনে দিনের পর দিন ভেকু মেশিন দিয়ে জমির উর্বর মাটি কেটে নেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। জমির উর্বরতা নষ্ট হলে তার ক্ষতি শুধু একজন কৃষকের নয় - এর প্রভাব পড়বে খাদ্য উৎপাদন ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, মাছ শিকারের জন্য কাংলার হাওরের বিলের পানি ছেড়ে দেওয়ায় শত একর বোরো জমি অনাবাদি থাকার আশঙ্কা। হাওরাঞ্চলে কৃষি ও মৎস্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কৃষকই। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থে ইজারাব্যবস্থার অপব্যবহার করে কৃষকদের সেচের পানি বন্ধ করে দেওয়া চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।
এই চারটি ঘটনা আলাদা হলেও মূল সংকট এক জায়গায়- প্রশাসনিক নজরদারি ও জবাবদিহির অভাব। আইন প্রয়োগে শৈথিল্য, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অপ্রতুল প্রস্তুতি এবং কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ না থাকলে সুনামগঞ্জের মতো পিছিয়ে পড়া জেলার মানুষ আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে।
এখনই সময়- দোয়ারাবাজারের লুটপাটের ঘটনায় দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা, সদর হাসপাতালে শয্যা ও জনবল বাড়ানো, ফসলি জমির মাটি কাটার বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা এবং হাওরে কৃষি-মৎস্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ ও কৃষকবান্ধব সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নইলে এই সংকটগুলো একদিন শুধু শিরোনামেই নয়, পুরো জেলার ভবিষ্যৎকেই গ্রাস করবে। রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে- হাওরের মানুষের নীরবতা দুর্বলতা নয়; তারা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে একদিন সেই দায় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়